ঢাকা | বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রামে মাথাচাড়া দিচ্ছে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ, এক মাসে গ্রেপ্তার ২০

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : May 31, 2026 ইং
চট্টগ্রামে মাথাচাড়া দিচ্ছে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ, এক মাসে গ্রেপ্তার ২০ ছবির ক্যাপশন:
ad728

গত ২৭ মে (মঙ্গলবার) নগরের ষোলশহর দুই নম্বর গেট এলাকায় ঝটিকা মিছিল করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। সরকারের অবহেলায় হামে শিশুমৃত্যুর অভিযোগ, ‘দেশবিরোধী মার্কিন চুক্তি’ বাতিল এবং ধর্ষকদের ফাঁসির দাবিতে এ বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পাঁচ থেকে সাত মিনিটের মধ্যে মিছিল শেষ করে অংশগ্রহণকারীরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত নগরের জিইসি মোড়, ষোলশহর, সিআরবি, মেহেদীবাগ, খুলশী ও কোতোয়ালিসহ বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১০টি ঝটিকা মিছিল হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ২০ থেকে ৩০ জন অংশ নেন।

সবচেয়ে বেশি কর্মসূচি হয় ২৪ এপ্রিল। ওই দিন নগরের অন্তত চারটি এলাকায় আকস্মিক মিছিল করেন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। পরে অভিযান চালিয়ে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর ১ মে পটিয়ার মনসা বাদামতল এলাকায় দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের ব্যানারে মিছিল করা হয়। ৮ মে আনোয়ারার ভিংরোল এলাকায় একটি সেতুর ওপর মিছিল করে নেতা-কর্মীরা। সেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার এবং ছাত্রলীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

গত ১১ মে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাঠানিপুল এলাকায় দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের আরেকটি মিছিল হয়। ১৪ মে খুলশীর ওয়াসা মোড় এলাকায় ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এছাড়া ২০ মে কোতোয়ালি থানার ডিসি হিলসংলগ্ন এলাকায় সংক্ষিপ্ত মিছিল ও পথসভা করেন সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব কর্মসূচির নেপথ্যে রয়েছেন ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান পর্যায়ের নেতা। তাদের মধ্যে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া উপকমিটির সদস্য নুরুল আজিম রনি এবং চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া দস্তগীরের নাম স্থানীয়ভাবে আলোচনায় রয়েছে।

একাধিক সূত্র বলছে, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, সাবেক ছাত্রনেতা, ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী মহলের একটি অংশের আর্থিক ও সাংগঠনিক সহায়তায় এসব কর্মসূচি হচ্ছে। মূলত মাঠে উপস্থিতি জানান দেওয়া এবং রাজনৈতিক আধিপত্য ধরে রাখার লক্ষ্যেই এমন ঝটিকা কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিছিলের ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে সংগঠনটির অস্তিত্ব ও সক্রিয়তা জানান দেওয়ার কৌশল নেওয়া হয়েছে। ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এসব ভিডিও পোস্ট ও শেয়ার করছেন রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। এর মধ্যে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকেও মিছিলসংক্রান্ত একাধিক ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। একইভাবে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া দস্তগীরের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকেও মিছিলের বিভিন্ন মুহূর্ত তুলে ধরে ভিডিও পোস্ট করা হয়, যা দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ বলেন, ‘নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো সংগঠনের ব্যানারে প্রকাশ্যে মিছিল-সমাবেশ করার সুযোগ নেই। যারা এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। ঈদ ও পশুর হাটকেন্দ্রিক ব্যস্ততার সুযোগে তারা মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে। মাঠপর্যায়ে বড় কোনো নেতা নেই। কিছু উঠতি বয়সী তরুণকে টাকার বিনিময়ে এসব কর্মসূচিতে আনা হচ্ছে।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. এনায়েত উল্ল্যাহ পাটোয়ারী ঢাকা পোস্টকে বলেন,‘আওয়ামী লীগের এখনো একটি সামাজিক ভিত্তি রয়েছে। বিদেশে অবস্থানরত নেতারা অর্থ ব্যয় করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করবেন, সেটি স্বাভাবিক। আওয়ামী লীগ বড় রাজনৈতিক দল হওয়ায় তাদের গ্রহণযোগ্যতার একটি অংশ এখনো টিকে আছে।’

কেন তারা সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে– এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে যে ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়েছিল, সে কমিশনের প্রস্তাবনা অনুযায়ী বর্তমান সরকার কাজ করছে না, যা নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে একধরনের টানাপড়েনের সৃষ্টি হয়েছে। সংসদে বা সংসদের বাইরে সরকার ও বিরোধী দলের মুখোমুখি তা বক্তব্যে প্রকাশ হচ্ছে। এই টানাপড়েন আওয়ামী লীগের সক্রিয় হতে সহায়তা করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘গণভোট নিয়ে সরকারের রয়েছে টালবাহানা। দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত করেছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই, ফলে এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিদেশে পলাতক আওয়ামী লীগের নেতারা দেশে তাদের কর্মী ও সমর্থকদের দিয়ে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে।’

মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী জিয়া হাবীব আহসান ঢাকা পোস্টকে বলেন,‘কোনো সংগঠন নিষিদ্ধ হলে আইনগতভাবে তাদের কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হবে। তবে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও যেন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ না ওঠে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া, তাদের এ মিছিলগুলোর নেপথ্যে বিদেশি পলাতক নেতারা ও কিছু প্রভাবশালীর ইন্ধন থাকতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যদি তারা মনে করে তাদের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে, তাহলে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ তাদের রয়েছে। আদালতের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে তারা সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতে পারবে কি না।’

পুলিশের তথ্যমতে, গত এক মাসে চট্টগ্রামে ছাত্রলীগের অন্তত ১০টি ঝটিকা মিছিলের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৮ জনের বেশি নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘গোপন রাজনীতি’ নিষিদ্ধের দাবি জানাল ছাত্রদ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘গোপন রাজনীতি’ নিষিদ্ধের দাবি জানাল ছাত্রদ